শুক্রবার , জুন ২২ ২০১৮
Home / এক্সক্লুসিভ / আমেরিকায় অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে বহিষ্কার আতঙ্ক
Last weekÕs Immigration and Customs Enforcement (ICE) operation that netted 161 arrests in six Southern California counties was part of a nationwide Òseries of targeted enforcement operationsÓ that netted hundreds more detentions across the country, the U.S. Department of Homeland Security chief said in a statement Monday. (Photo courtesy of ICE)

আমেরিকায় অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে বহিষ্কার আতঙ্ক

এবার অর্ধশত বাংলাদেশিকে দেশে পাঠানো হচ্ছে। নিউইয়র্কের সানি সাইডে বসবাসরত কাগজপত্রহীন এক বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন ধরে একটি মামলা চলছিল। ফেব্রুয়ারির শুরুতে আদালত যেদিন ওই মামলায় তাঁকে নির্দোষ বলে রায় দিয়েছেন, সেদিনই বাসার সামনে থেকে তাঁকে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পাঠিয়ে দেয় নিউজার্সির আটক কেন্দ্রে। সেখানে আগে থেকেই বন্দী ছিলেন কুইন্সের হলিসের বাসিন্দা আবাসন ব্যবসায়ী কাজী আরজু ও নিউজার্সি অঙ্গরাজ্য থেকে গ্রেপ্তার আমিনুল ইসলাম।

নিউজার্সির আটলান্টিক সিটিতে বসবাসরত আরও একজন বাংলাদেশিসহ নিউজার্সির এই আটক কেন্দ্রে থাকা প্রায় ১২ জন বাংলাদেশিকে ৫ ফেব্রুয়ারি টেক্সাসের লুইজিয়ানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নিউইয়র্ক, নিউজার্সি ছাড়াও টেক্সাস, পেনসিলভানিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া, মিশিগান, ফ্লোরিডার নানা জায়গা থেকে আটক করা এমন বাংলাদেশিদের সংখ্যা ৫০-৬০ জন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অভিবাসন পুলিশের অনিয়মিত ফ্লাইটে তাঁদের সবার গন্তব্য এখন বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবার, অভিবাসন অধিকার কর্মী আর আইনি পরামর্শকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

আমেরিকার মূলধারার মানবাধিকার সংগঠন আমেরিকান সিভিল রাইটস মুভমেন্টের বড় সহযোগী সংগঠন ড্রামের একজন বাংলাদেশি সংগঠক কাজী ফৌজিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এখন আগে থেকে অবৈধ অভিবাসীদের রাখা আটক কেন্দ্রগুলো খালি করা হচ্ছে। নিউজার্সিতে ১৯ মাস আটক থাকার পর এক পাকিস্তানিকেও পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারির ফ্লাইটে। এমনকি অবৈধ অভিবাসী বহিষ্কারবিরোধী আন্দোলনের নেতা ল্যাটিন আমেরিকার অভিবাসী রাজীব রাগবীরকেও (যিনি বাংলাদেশি রিয়াজ তালুকদারের বহিষ্কার আন্দোলনে শীর্ষে ছিলেন) পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে জেনেছি। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এখন সামান্য অপরাধ রেকর্ড আছে এমন কাগজপত্রবিহীন ব্যক্তিদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেননা, এরই মধ্যে আটক কেন্দ্রগুলোতে আটক ব্যক্তিদের পাঠিয়ে দেওয়ার সব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এগুলো শেষ হলেই সাধারণ কাগজপত্রহীন ব্যক্তিদের ধরপাকড় শুরু হতে পারে।

ব্রঙ্কসে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইনি পরামর্শক নাসরিন আহমেদ বলেন, বহিষ্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া হলেও আগের চেয়ে এটা এখন অনেক বেড়েছে। সাধারণ অপরাধীদের বহিষ্কারের হার এখন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনকারীদের বেলায়ও বহিষ্কারের পক্ষে রায় বেড়েছে কমপক্ষে ২০ শতাংশ। এমন অনেক বিচারক ছিলেন, যাঁদের আমরা চিনতাম যে তাঁরা অভিবাসীবান্ধব, সামন্য যুক্তি আর কাগজপত্র উপস্থাপন করলেই যাঁর কাছে মামলা অনুমোদন হয়ে যেত, তিনিও এখন বহিষ্কারের পক্ষে বেশি বেশি রায় দিচ্ছেন। সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে, তাঁরা অভিবাসনবিরোধী স্রোতে ঢুকে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আইনজীবীরা এমন সব বিষয় যুক্তি-তর্কে নিয়ে আসছেন, যেখানে বিচারকেরা বিহষ্কারের পক্ষে রায় দিতে প্রভাবিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশিসহ অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের নির্বিঘ্নে পাঠাতে অভিবাসন দপ্তর নিবিড়ভাবে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২৩টি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বহিষ্কার কার্যকর করার চুক্তি করেছে। সেই চুক্তি অনুযায়ী যিনি যেই দেশের নাগরিক, তাঁদের সেই দেশ গ্রহণ করবে বলে বলা আছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের এল পাসো কারাগারে অনশনকারী বাংলাদেশিদের একসঙ্গে দেশে ফেরত পাঠানোর পর এবারই প্রথম বড় আকারের আরও একটি দল বাংলাদেশে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এসব অভিবাসীর বহিষ্কার নিয়ে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।
কাজী আরজুর স্ত্রী উম্মে হানি লুবনার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। যখন কথা হয় তখন তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে পাল্টা প্রশ্ন রাখেন, ‘আসলেই তাঁর আর এখানে থাকার কোনো উপায় নেই?’ লুবনা বলেন, আরজুর সঙ্গে টেলিফোনে তাঁর কথা হয়েছে, তাঁকে টেক্সাসে নেওয়া হয়েছে। তাঁর সঙ্গে অনেক বাংলাদেশিকেও সেখানে রাখা হয়েছে।

বহিষ্কারে মানবিকতাও রক্ষা হচ্ছে কম
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য গ্রেপ্তার করা কাগজপত্রহীন বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সুরক্ষার পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে। কাজী আরজুর স্ত্রী উম্মে হানি লুবনা বলেন, ‘আমার স্বামী ২৫ বছর ধরে এই দেশে বসবাস করছেন, আয়কর পরিশোধ করেছেন। তাঁদের তিন সন্তান এই দেশের পাসপোর্টধারী নাগরিক, আমি নিজেই এ দেশের নাগরিক। ছোট মেয়েটি স্কুলে কান্নাকাটি করে, এ জন্য আমাকে তিনবার স্কুল থেকে ডাকা হয়েছে। আমি সব বলেছি তাদের। এই সন্তানেরা যেন বাবার আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য আমি আবেদন করতে চেয়েছিলাম স্থানীয় কংগ্রেস অফিসে। তারা প্রমাণ হিসেবে সন্তানের স্কুল থেকে একটি চিঠি নিয়ে আসতে বলেছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ সবকিছুই জানে, তবু তারা আমার সন্তানের পক্ষে একটি চিঠি দিতে অপারগতা জানিয়েছে। এমনকি কারাগারে আটক অবস্থায় কাজী আরজুর সঙ্গে প্রতি মিনিট কথা বলতে গিয়ে প্রায় ৬০-৭০ ডলার করে খরচ করতে হচ্ছে। আমেরিকার নাগরিক হয়েও তার সন্তানেরা তাদের বাবার পক্ষে কথা বলতে পারবে না কেন?’

নিউজার্সি থেকে গ্রেপ্তার আমিনুল হকের এক মেয়ে, দুই ছেলে। বড় মেয়ে ইভানার বয়স ১৯ বছর। তিনি ইউনিয়ন কাউন্টি কলেজে পড়ছেন। একটি ফার্মেসিতে খণ্ডকালীন কাজও করছেন। কিন্তু বাবার গ্রেপ্তারে তাঁর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করায় তিন সন্তান নিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছেন রোজিনা আক্তার। আমিনুল হক ২০০৪ সালে স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। এরপর এখানে তাঁর ছোট ছেলের জন্ম হয়। এখন উপার্জনক্ষম বাবার অবর্তমানে পরিবার কীভাবে দিন কাটাবে, সেই চিন্তায় দিশেহারা আমিনুলের স্ত্রী আর সন্তানেরা।

এমন একটি সময়ে খুব কম মানুষের পক্ষেই জোরালো আন্দোলন হচ্ছে অথবা এটি নিয়ে গণমাধ্যমে কথা হচ্ছে। সর্বশেষ কানসাস থেকে গ্রেপ্তার হওয়া রসায়নের অধ্যাপক সৈয়দ জামালের পক্ষে আমেরিকার মূলধারার সব গণমাধ্যম একযোগে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাঁর ভাগ্যে কী জুটবে, সেটা বলা যাচ্ছে না। সৈয়দ জামালের তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ বলা চলে অন্ধকার। কেননা, তাঁর স্ত্রী বেঁচে আছেন মাত্র একটি কিডনি নিয়ে। এসব ক্ষেত্রে বহিষ্কার হলে পরিবারগুলো যেখানে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া সন্তানেরা আছে, তাদের অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে সেটারও কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

আইসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২০ জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ বছরের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আড়াই লাখ অবৈধ অভিবাসীকে আমেরিকা থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা কয়েক শ হতে পারে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের আতঙ্কে আরও ৫-৬ হাজার বাংলাদেশি স্বেচ্ছায় আমেরিকা ত্যাগ করেছেন। এঁদের অনেকেই পাড়ি দিয়েছেন কানাডায়।

Comments

comments

Check Also

ফাঁসি দেওয়ার আগে জল্লাদ অপরাধীর কানে কি বলে থাকে জানেন?

ফাঁসি দেওয়ার আগে জল্লাদ- ভারতে সেরকম ভাবে খুব কম ফাঁসি দেওয়া হয়ে থাকে । অন্যান্য …

error: Content is protected !!